মাওলিননং, ভারতের এই গ্রামে ঈশ্বর বাস করেন

আমি নিজে জন্মেছি একটি গ্রামীণ এলাকায়। বাংলা, বিহার, ওড়িশার বহু গ্রাম আমি ঘুরে এসেছি। কিন্তু মেঘালয়ের এই গ্রাম আমাকে অবাক করে দিয়েছে। ঘন নীল আকাশ, সবুজে ভরা গাছগাছালি, রকমারি ফুলবাহারি, কত প্রজাপতির ওড়াউড়ি। সুন্দর করে বাড়িগুলো সাজানো। এ গ্রামের সবাই শিক্ষিত। সুন্দর রুচির ছাপ সর্বত্র। ডাস্টবিনগুলোও সুন্দর, অদ্ভুত। না শুধু গ্রামকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখেই যে পৃথিবীর সেরা গ্রাম, তা নয়। গ্রামের মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, বাড়িঘর, সব কিছু একদম ঝকঝকে, তকতকে। এখানে কেউ যত্রতত্র কিছু ফেলতে পারে না, মদ খাওয়ার অনুমতি নেই বাইরে। কারোর সঙ্গে বিরূপ ব্যবহার করা যায় না, ফুল তোলা বা গাছের পাতা ছেড়াও নিষেধ। রয়েছে আরও নিয়মবিধি। এই গ্রামটির নাম মাওলিনং (Mawlynnong)। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে ৭৭ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। 

মাওলিননং গ্রামের কিছু ছোট্ট বন্ধু

ভারতবর্ষের পঞ্চায়েতিরাজ ব্যবস্থার অন্তর্গত এই গ্রামও। কিন্তু  এক গ্রামবাসী জানালেন এখানে পঞ্চায়েতের মোট বাজেটের ১০০% খরচ তারা করে থাকেন। শুধু তাই নয় টাকার হিসেবও গ্রামবাসীদের সভা ডেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় প্রধানের তরফে। খাসি উপজাতির মানুষরাই মেঘালয়ের মূল বাসিন্দা। এই গ্রামের সবাই খাসি। তাদের এই অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা দেখে আমি তো অবাক। যেখানে গ্রাম পঞ্চায়েত মানেই আমি চিরদিন দেখে এসেছি কেবল চুরি-বাটপারি এই সব। রাস্তাগুলো দেখলে আপনার মন ভরে যাবে। আর আমাদের এখানে রাস্তা ভালো হলে আমরা সেখানে ইচ্ছে মতো ট্রাক, লরি ঢুকিয়ে সেই রাস্তা নষ্ট করে দিয়ে থাকি।

মাওলিননং গ্রামের সুন্দর সকাল

আর পরিচ্ছন্নতা? তার জন্যই তো এই গ্রাম বিখ্যাত গোটা পৃথিবীতে। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের সম্মান পেয়েছে এই মাওলিনং। সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন গ্রামের স্বীকৃতি পেয়েছে পরপর দুবার আন্তজার্তিক ট্রাভেল ম্যাগাজিনের থেকে। এর আগে ২০১৩ সালেও এ গ্রামটি এশিয়ার পরিচ্ছন্ন গ্রামের স্বীকৃতি পায়। ওয়ার্ল্ডস ক্লিনেস্ট ভিলেজ (World's Cleanest Village) বলা হয় গ্রামটাকে! গ্রামের কোনও বাসিন্দাই যত্রতত্র আবর্জনা ফেলেন না বরং এখন তারা প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার ওপরে জোর দিয়েছেন। গ্রামের জঙ্গল এবং সবুজায়ন রক্ষা করতে মাওলিননংয়ের বাসিন্দারা নিয়মিত গাছ লাগান।

আরও একটা জিনিস অবাক করেছে, এখানকার বাসিন্দাদের সারল্য। কাউকে কোনও কথা বললে সুন্দরভাবে একটা হাসি দিয়ে তার জবাব দেয় এঁরা। যা আপনাকে অবাক করবে। শিলং থেকে মাওলিননংয়ের দূরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার। ভারত এবং বাংলাদেশের সীমান্তে পাহাড়, জঙ্গল, ঝর্নায় ঘেরা এই গ্রামটি মেঘালয়ের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। গ্রামের পাহাড়ি একটি ঝর্নার উপরে গাছে শিকড়ের তৈরি সাঁকোও (Living root Bridge) পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের স্থান। আর একটা অদ্ভুত জিনিস আছে এই গ্রামের কাছেই। তার নাম ব্যালেন্সিং রক। একটা ছোট পাথরের ওপর একটা আস্ত বড় পাথর প্রাকৃতিক ভাবে ব্যালেন্স করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই গ্রামের বাইরে লেখা আছে গডস ওন গার্ডেন অর্থ্যাৎ ঈশ্বরের বাগান। আর এই গ্রামে থেকে আমারও মনে হয়েছে ঈশ্বর যদি এই গ্রামে না থাকেন তাহলে হয়তো পৃথিবীর কোনও জায়গাতেই থাকবেন না। সত্যিই এক ঐশ্বরিক অনুভুতি।

কেমন খরচ এই মাওলিননং ঘুরতে?

মাওলিননং গ্রামের ব্যালেন্সিং রক


গ্রামে ঢোকার জন্য একটা এন্ট্রি চার্জ দিতে হয়। সেটা ওই ১০০ টাকার মতো। আপনার টাকা এই গ্রামেরই উন্নয়নে ব্যবহার হবে। আর থাকার জন্য ১০০০-১৫০০ -এর মধ্যে হোমস্টে পেয়ে যাবেন। খাওয়া-দাওয়ার জন্য খরচ পড়বে ওই মাত্র ২০০-৩০০ টাকা। আর কলকাতা থেকে শিলং যাওয়ার যে খরচ সেটা এর মধ্যে ধরলাম না। কারণ শিলং গেলে তো আর আপনি শুধু এই গ্রাম ঘুরবেন না। আরও অনেক কিছু দেখবেন। এর কাছাকাছি রয়েছে ডাউকি নদী। যা পৃথিবীর স্বচ্ছ নদীগুলির মধ্যে একটি। তার কথা থাকবে অন্য পর্বে। আর গ্রাম সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন। 

Youtube Embed Link 1

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ